সরকারদলীয় বিএনপি নেতাদের সহায়তায় দেলোয়ার হোসেন ওরফে হাজী দেলোয়ার নামের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার বিরুদ্ধে ‘ভূমিদস্যুতা’ ও ‘জুলুম-জালিয়াতি’র অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযুক্ত দেলোয়ার আরএফ বিল্ডার্স নামের ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তিনি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা।
অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি কক্সবাজার শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ভূমি ও আবাসন প্রকল্প উন্নয়নের নামে জমি দখল, ফ্ল্যাট বিক্রির নামে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি এবং মাস্তান ভাড়া করে জমির জবরদখল করেছেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন কক্সবাজার শহরের উত্তর বাহারছড়ার বাসিন্দা ও স্থানীয় মৃত আবদুল হাকিমের ছেলে মুজিবুর রহমান মিল্টন।
কক্সবাজার প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে হাজী দেলোয়ার ও তার প্রতিষ্ঠানের অন্যায়, জুলুম, জালিয়াতি ও ভূমিদস্যুতার নানা অভিযোগ তুলে ধরে মুজিব বলেন, আমার বাবা মৃত আব্দুল হাকিম কক্সবাজার শহরতলির ঝিলংজা মৌজার কলাতলী ভাঙ্গার মুখ এলাকার ‘স্যাম্পান হোটেল’র পূর্ব ও দক্ষিণে ৭৫ শতক জমি কিনেছিলেন। ১৯৯৪ সালে কেনা সেই জমিতে ঘর নির্মাণ ও সাইনবোর্ড স্থাপন করেন এবং নিজের নামে খতিয়ান তৈরি করেন। পরে মেরিন ড্রাইভের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলে আমার বাবা আব্দুল হাকিম ওই জমি থেকে ১০ শতাংশের ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারি অর্থও গ্রহণ করেন।
মুজিবের দাবি, মেরিন ড্রাইভ নির্মাণের পর জমির মূল্য বৃদ্ধি পেলে পার্শ্ববর্তী শামসুল ইসলাম ও তার স্ত্রী কোহিনুর আরা বেগম এবং তাদের ছেলেরা লোভের বশবর্তী হয়ে বারবার তাদের জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ তৈরি করেন। ওইসময় তার বাবা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন, যা সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে বিচারাধীন। ওই মামলায় বিচারিক আদালত বিরোধীয় জমিতে কোনো প্রকার রূপ পরিবর্তন না করতে ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) বা নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, যা এখনো বহাল আছে।
তিনি আরও বলেন, ওই মামলায় বিবাদী হয়ে শামসুল ইসলাম ও কোহিনুর বেগম তৎকালীন এডিএমের স্ত্রী চৌধুরী এবং তার ঘনিষ্ঠ একজনকে জমির চারটি দাগের দুই দাগে প্রায় স্বত্বহীন জমি বিক্রি করেন। পরে এডিএমের প্রশাসনিক প্রভাবে সামান্য কিছু জমির সিকস্তি ও অধিগ্রহণের অজুহাত তুলে আবদুল হাকিমের বৈধ সম্পূর্ণ খতিয়ান বাতিল করেন। এ ঘটনায় আবদুল হাকিম দেওয়ানি আদালতের আশ্রয় নেন, যা এখনো চলমান।
অন্যদিকে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ‘রাজনৈতিক সহযোগিতায়’ তারা সেই জমি জবরদখল করে নেন। এ ঘটনায় তাদের সহযোগী হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন আরএফ বিল্ডার্সের মালিক হাজী দেলোয়ার, আহমেদ শফি এবং দুই ছেলে ফারুক ও ফয়সাল। পরে সেই জমিতে আরএফ বিল্ডার্স বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাইলে আবদুল হাকিম বাধা দেন। একই সঙ্গে এডিএম কোর্টে ফৌজদারি মামলা করেন। আদালত প্রথমে ১৪৪ ধারা জারি এবং পরে জমির উপরে ১৪৫ ধারা জারি করলে আরএফ বিল্ডার্স কর্তৃপক্ষ আইনি বিপাকে পড়ে প্রতারণার আশ্রয় নেন।
জমির উত্তরাধিকারী দাবিদার মুজিব বলেন, আরএফ বিল্ডার্স ও হাজী দেলোয়ার সাময়িকভাবে আমাদের আইনি ও প্রশাসনিক বাধা এড়াতে আমার বাবার নামজারি করা ১৯ দশমিক ১৭ শতক জমি থেকে ১৪ শতাংশ জমির জন্য ২০ লাখ টাকা অগ্রিম বিনিময়ে আমাদের সঙ্গে জমি কেনার একটি ‘নাটক চুক্তি’ করেন এবং ভবনের কাজ শুরু করেন। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয়, তারা আসলে জমি ক্রয় করার জন্য নয়, বরং তৎকালীন আইনি বাধা এড়াতেই প্রতারণামূলক নোটারি চুক্তির নাটক সাজিয়ে ছিলেন। মৌখিক এবং লিখিত চুক্তি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ না নিয়ে তারা ভবনের সেমি বেজমেন্ট করে। পরবর্তী সময়ে আমার বাবার বাধা এবং আদালতের ‘স্ট্যাটাস কো’ (স্থিতাবস্থা) বহাল থাকায় দীর্ঘ ১৫ বছর প্রকল্পটির কাজ বন্ধ থাকে।
তিনি দাবি করেন, আদালতে বিচারাধীন ও জমি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিএনপি নেতা-কর্মীদের টাকার বিনিময়ে ব্যবহার করে আওয়ামী চক্রের সঙ্গে আড়াই কোটি টাকার নোটারি বায়না এবং আবারও সেই জমিতে বহুতল ভবনের কাজ শুরু করতে উঠে পড়ে লেগেছেন সাতকানিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা হাজী দেলোয়ার, আহমেদ শফি এবং তার দুই ছেলে ছাত্রলীগ নেতা ফারুক ও ফয়সাল। আওয়ামী লীগ সরকার না থাকলেও বিএনপি সরকারের এসময়েও দলের নেতাদের মাধ্যমে পূর্ণ ক্ষমতা খাটাচ্ছেন হাজী দেলোয়ার।
এ বিষয়ে মুজিবুর রহমান ও তার পরিবার প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল ও অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না এবং স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মুজিবুর রহমানের দাবি, আওয়ামী লীগ নেতা হাজী দেলোয়ারের এই ‘অবৈধ নির্মাণকাজ’ বন্ধে কক্সবাজার পুলিশ সুপার, কক্সবাজার সদর মডেল থানা, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে আরএফ বিল্ডার্সের এমডি দেলোয়ার হোসেন ওরফে হাজী দেলোয়ারের মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে, আরএফ বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান আহমেদ শফিক বলেন, ‘এটা সিম্পল ব্যাপার। আমাদের সঙ্গে আবদুল হাকিমের চুক্তি হয়েছিল। আমরা টাকাও দিয়েছিলাম। কিন্তু পরে জানতে পারি, সেখানে তাদের কোনো জমি নেই। কিছু পেমেন্ট বাকি ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বড় বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ করি। যাচাই-বাছাই না করে কোনো প্রকল্প শুরু করি না। প্ল্যান পাস থেকে সব ধরনের অনুমতি নিতে হয়। সেখানে জমির মালিকানা ঠিক না থাকলে কীভাবে অনুমোদন মিলবে?’
সূত্র বলছে, হাজী দেলোয়ারের মালিকানাধীন আরএফ বিল্ডার্সের কক্সবাজার শহরেই পাঁচটি প্রকল্প রয়েছে। এছাড়া মহেশখালীসহ একাধিক উপজেলায় তাদের প্রকল্প চলমান। তবে, উন্নয়নের নামে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এসব প্রকল্পের একটিও বিগত ২০ বছরে শেষ করতে পারেনি আরএফ বিল্ডার্স। বরং, এসব প্রকল্পের ফ্ল্যাট বিক্রি ও প্রকল্প দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয় বিভিন্ন সময়।


