“স্বাস্থ্য সেবা মৌলিক অধিকার! দুধ বেচে বিড়ি খাওয়ার রাজ্যে?”

আমরা বিড়ি খাই, দেশি গাভীর দুধ বেচে বাড়ি ফেরার সময় পাউরুটি কিনে আনি।
আমরা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের যতটা যত্ন নিই, নিজের ত্বকের যত্ন তার এক অংশও নিই না।
আমরা পেট পুরে কোরবানির মাংস খাই, তারপর দু’চাকা হাইব্রিড শসা খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে মনে মনে ভাবি—শসা দিয়ে সব চর্বি গলিয়ে দিলাম!
আমরা এক অদ্ভুত প্রজাতি—গুড কোলেস্টেরল বাড়াতে বাদাম খাই, কিন্তু তাতে লবণ ছাড়া চলে না। ফলাফল: যেই লাউ, সেই কদু।

আমরা বাইক চালাই ন্যূনতম ৮০ কিমি/ঘণ্টা বেগে। ঈদের তিন দিন আগে কিশোর ছেলেটাকে হাসিমুখে বাইকের চাবি তুলে দিই।
বাচ্চা চিৎপাত হলে হাসপাতালে দৌড়াই। মেডিকেলের একজন ক্যাডার সার্ভিস অফিসারকে ভাই তো বলিই, পারলে ধরে পেটাই!
অন্যদিকে, দুর্ঘটনাকবলিত বাইক ছাড়াতে থানায় গিয়ে কনস্টেবলকে ‘স্যার স্যার’ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলি, চোরের মতো লুকিয়ে ঘুষ দিতে যাই—শুধু বড় সাহেব পর্যন্ত পৌঁছানোর সুযোগ পেতে।
তারপর আবার থানায় যাই আরেক বাইক নিয়ে, হেলমেট ছাড়া।

লিখতে গেলে কত শত কথা!
নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (অসংক্রামক রোগ) আমরা নিজের কর্মফলে অর্জন করি।
তারপর বুলি আওড়াই: “স্বাস্থ্য মৌলিক অধিকার”, “সরকার আমাদের দেখছে না”—ধরেই নিলাম, ক্ষণিকের জন্য সরকার সত্যিই দেখছে না।
সরকার আমাদের বিড়ি খেতেও দেখছে না, অপ্রাপ্তবয়স্কের হাতে বাইকের চাবি তুলে দিতেও দেখছে না, আমাদের স্বাস্থ্যের দুরাবস্থাও দেখছে না।

এবার বলুন, স্বাস্থ্যসেবা কোন এঙ্গেলে মৌলিক অধিকার?

সামাজিক শিষ্টাচারহীনতা, ব্যক্তিগত দায়িত্বহীনতা থেকে সৃষ্টি ক্ষোভ যাই হোক, আমি বলি—
স্বাস্থ্যসেবা মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত (শর্তসাপেক্ষে)।

বর্তমানে আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা মোটেও মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত নয়।
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, UN-ভুক্ত সব দেশে স্বাস্থ্যসেবা মূলত মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত—
আর সে কারণেই জাতিসংঘ এটিকে ‘মৌলিক মানবাধিকার’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

এটিকে স্বদেশে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সংশ্লিষ্ট দেশের সংবিধানে স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
বাংলাদেশে এখনো তা সম্ভব হয়নি।

তবে, খুব সম্প্রতি স্বাস্থ্য রিফর্ম কমিশন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।

আরও কিছু ক্ষোভের কথা মাথায় এলো—
স্বাস্থ্য মানে শুধু ব্যক্তিগতভাবে সুস্থ থেকে নয়টা-পাঁচটা ঠেলে দেওয়া নয়।
স্বাস্থ্যের অধিকার মানে তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে:

মানুষের জল, জঙ্গল, জমির অধিকার,

মানুষের জীবন-জীবিকার অধিকার,

আইনশৃঙ্খলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার,

এবং মানুষের অন্যান্য সরকারি পরিষেবাগুলো পাওয়ার অধিকার।

দিনের পর দিন এই দেশে “অধিকার” শব্দটাকে হয় ব্যঙ্গের অভিধানে ছুঁড়ে ফেলা হয়,
অথবা তীব্র অবজ্ঞায় ভুলিয়ে দেওয়া হয়।
আর আমরা আশা করি—কোনো এক ৭ই এপ্রিল, “বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে”, হঠাৎ সবাই নিজেদের স্বাস্থ্য-অধিকার নিয়ে সচেতন হয়ে উঠবে!
এটা হয় না।

আমরা কেউ কারও লড়াই লড়ে দিতে পারি না, কেউ কারও হয়ে চিৎকারও করে দিতে পারি না।
কিন্তু এই দেশের একটা দীর্ঘ ইতিহাস ছিল, যেখানে মানুষ সর্বংসহা হয়েও সময়মতো চিৎকার করতে জানত।

তা না হয় ভুলে যাক!
নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া শিখুক—
সাবান না থাকুক, অন্তত এটেল মাটির টুকরো দিয়ে, ছাই দিয়ে ঘষে পরিষ্কার থাকা এবং সুস্থ থাকা, সেই ন্যূনতম চর্চা শিখুক।

আর যদি ভাবেন: “মেরা জিসম, মেরি মার্জি”,
তাহলে হাসপাতালে এসে চিৎকার করবেন না।
কারণ—
“মেরা মার্জি নেহি তুমকো হোমমেড প্রবলেম সলভ করনে কে লিয়ে, রাজকোষ ছে কৌরি বরবাদি।”

সত্য বচন:

বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা এখনো মৌলিক অধিকার নয়,
তবুও রাষ্ট্র এটিকে মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে।
স্বাস্থ্য সচিব মহোদয়ের স্ত্রী করোনায় মারা গেছেন,
দেশবরেণ্য চিকিৎসক অধ্যাপকগণ করোনায় জীবন দিয়েছেন,
পরিচ্ছন্নতা কর্মী থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা—
সবার ত্যাগ, পরিশ্রম, দিনরাতের প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্যসেবা আজ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে,
এটিকে মৌলিক অধিকার ভাবলে অতি-উক্তি হবে না।
এই কথা আদালতে দাঁড়িয়েও বলা যায়।

– মুকুল এইচ প্রামাণিক
স্বাস্থ্যকর্মী, শ্রমিক-অধিকার কর্মী ও গণ-কর্মচারী
সদস্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

  • Related Posts

    যে মুখায়বে ফুটে উঠেছে বাংলা মায়ের মুখচ্ছবি

    (আপোষহীন দেশনেত্রী ম্যাডাম জিয়ার কথা বলছি… বিস্তারিত: কি আশ্চর্য রকমের স্নিগ্ধ সে মুখখানি? কি অবুঝ, সরলরেখায় মমত্বের মাধুর্য মুখে। এ যেন শুধু বন্ধন নয়, বিশ্বাস! আমাদের প্রাণপ্রিয়, আপোষহীন দেশনেত্রী, হার…

    জিল্লুর রহমান চৌধুরী বাবুল

    যুগ্ন-আহবায়ক, নাটোর জেলা বিএনপি। সদ্য গঠিত এই নতুন কমিটিতে সম্মানিত হয়েছেন, একজন পরীক্ষিত সৈনিক; আদর্শ এবং নীতির নিদারুণ বাস্তবতা পরোয়া না করে; সবসময় অবিচল থেকেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ’কে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *