সড়ক দুর্ঘটনায় নিভে গেল কোটালীপাড়ার পাঁচ পরিবারের আলো, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে লিমা–পলি ও ছয় বছরের এলেক্স

ভেতরের খবর নিউজ ডেস্ক:  এফ এম মিরাজুল সৈকত , কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ):
লিমা বিশ্বাস (২০) ও পলি বিশ্বাসের (১৬) জীবনে যেন একের পর এক নেমে এসেছে অন্ধকার। দুই বছর আগে দিনমজুর বাবা পংকজ বিশ্বাসের মৃত্যু হয়েছিল। এবার মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন তাদের একমাত্র ভরসা, দিনমজুর মা কামনা বিশ্বাসকে (৪১)। ছয় বছরের ছোট ভাই এলেক্সকে নিয়ে নাসিং পড়ুয়া লিমা ও দশম শ্রেণির ছাত্রী পলি কীভাবে পাড়ি দেবে জীবনের বাকি পথ—এই প্রশ্নই এখন ভারী করে তুলেছে স্বজনদের হৃদয়।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় মাদারীপুর সদর উপজেলার ঘটকচর মিলগেটে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত হয়। সাতজনের মধ্যে ৫ নারী দিনমজুরের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার পাইকের বাড়ি গ্রামে। এদেরই একজন ছিলেন কামনা বিশ্বাস। তার আয়ে চলতো পুরো সংসার ও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ। মায়ের মৃত্যুতে দুই বোন ও শিশুসন্তানটির আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ।
নিহত পাঁচ নারী দিনমজুর হলেন কোটালীপাড়া উপজেলার পাইকের বাড়ি গ্রামের রনজিত বাড়ৈর স্ত্রী শেফালী বাড়ৈ (৪২), পংকজ বিশ্বাসের স্ত্রী কামনা বিশ্বাস (৪১), পলাশ বাড়ৈর স্ত্রী দুলালী বাড়ৈ (৪৫), প্রকাশ বাড়ৈর স্ত্রী আভা বাড়ৈ (৫০) এবং জয়ন্ত বাড়ৈর স্ত্রী অনিতা বাড়ৈ (৪০)। তারা সবাই একই গ্রামের একই বাড়ির বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয়।
নিহত সাতজনের মধ্যে পাঁচ নারী দিনমজুরের মরদেহ নিজ গ্রামে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে শোকস্তব্ধ হয়ে উঠেছে কোটালীপাড়া উপজেলার পাইকের বাড়ি গ্রাম। কান্না, হাহাকার আর নিস্তব্ধতায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক।
মাদারীপুর সদর থানা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রবিবার সন্ধ্যায় সদর উপজেলার ঘটকচর মিলগেট এলাকায় সার্বিক পরিবহনের একটি বাস একটি ইজিবাইককে চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ইজিবাইকের চালক, ইজিবাইকের পাঁচ যাত্রী এবং বাসের এক হেলপার নিহত হন।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকালে পাইকের বাড়ি গ্রামের বাড়ৈ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে পাঁচটি মরদেহ। স্বজনদের বিলাপে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রতিবেশীরাও। একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে স্বজনরা।

নিহত দুলালী বাড়ৈর দেবর বিপুল বাড়ৈ বলেন, “পরিবারের স্বচ্ছলতার জন্য ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা জীবিকার তাগিদে পাশের মাদারীপুর জেলায় কাজে যেতেন। সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু রবিবার অতিরিক্ত কাজ থাকায় বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ শেষে সন্ধ্যায় ইজিবাইকে করে ফেরার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।”
পাইকের বাড়ি গ্রামের ইউপি সদস্য অখিল ওঝা বলেন, “দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমি রাতেই মাদারীপুরে যাই। রাত ২টার দিকে লাশগুলো নিয়ে গ্রামে ফিরি। পুরো এলাকা আজ শোকস্তব্ধ। পরিবারগুলো এমনিতেই দরিদ্র ছিল। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তারা সম্পূর্ণভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছে। সরকারের কাছে দাবি জানাই—এই অসহায় পরিবারগুলোর পাশে যেন দাঁড়ানো হয়।”
একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে একই বাড়ির পাঁচটি পরিবারের পাঁচ নারীর জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ায় পাইকের বাড়ি গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোক ও নিস্তব্ধতা।

# এফ এম মিরাজুল সৈকত , 19.01.2026
01811953261

  • Related Posts

    আদালতের ১৪৪ ধারার আদেশের পরও নির্মাণকাজের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ

    কক্সবাজার প্রতিনিধি: কক্সবাজারের পর্যটন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ কলাতলী মোড়ে ৩৪ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধের মধ্যেই ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে আরএফ বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে। আদালতের ১৪৪ ধারার আদেশের পরও সেখানে নির্মাণকাজ চলার অভিযোগে…

    মায়ের হাত ভাঙার কথা জানালেন জামায়াতের এমপি রাহাদ

    ভেতরের খবর নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ অভিযোগ করেছেন, জামায়াতে ইসলামী করার কারণে তাঁর বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয় এবং তাঁর মাকে মারধর…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *