“জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস – সত্যিকার সহায়ক, নাকি ছদ্মবেশী নজরদারি ?”

বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের (OHCHR) অফিস খোলার প্রস্তাব অনেকেই “সহায়ক” বলে চালিয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু একটু পেছনে তাকালেই বোঝা যায়, এই অফিস একবার যেখানে বসে, সেখানেই শুরু হয় আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ, বিদেশি প্রভাব, এবং একধরনের “নরম উপনিবেশবাদ”।

আমরা যদি অতীত উদাহরণ দেখি – আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, দক্ষিণ সুদান – এই দেশগুলোতেও জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস ছিল। বাস্তবে দেখা গেছে, এই অফিসগুলো সেইসব দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ ও বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের আগে থেকেই “তথ্য সংগ্রহ” করত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের নামে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সেই দেশগুলোকে বদনাম করত। ফলাফল? স্বরাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ওপর বিদেশি প্রভাব বাড়তে থাকে।

আমরা কি এটা চাই – একটা বিদেশি অফিস ঢুকে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমকে ছোট করে, বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার মতো রিপোর্ট বানাবে? তারা যদি নিজের মতো করে কিছু সংস্থা বা NGO-কে ‘বিশ্বস্ত সূত্র’ বানিয়ে নেয়, সেখান থেকে কি রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের রিপোর্ট আসবে না?

আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো – এই অফিস প্রতিষ্ঠার শর্তাবলীর মধ্যে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তাদের কোনো কর্মী, দলিলপত্র বা ডেটা বাংলাদেশ সরকারের কোনো সংস্থা বা আদালত, এমনকি হাইকোর্টও চাইলেও জব্দ বা তল্লাশি করতে পারবে না। অর্থাৎ তারা যা খুশি তাই করতে পারবে, অথচ আমাদের দেশের আইন সেখানে কোনো কাজ করবে না! এটা সরাসরি আমাদের আইন ও সার্বভৌমত্বের অপমান।

এত বড় একটি সিদ্ধান্ত, যেখানে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশের ভেতরে কার্যত স্বাধীনভাবে কাজ করবে, সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সকল রাজনৈতিক দলকে ডেকে তাদের মতামত নেওয়া ছিল অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সেটা না করে একতরফাভাবে অনুমতি দিয়ে, যেভাবে ড. ইউনুস এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে – তিনি কি এই অফিসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি নতুন চাপের মুখে ফেলতে চাচ্ছেন? দেশের ভেতরের রাজনীতি আন্তর্জাতিকভাবে জটিল করে তোলার একটি কৌশল কি এর পেছনে কাজ করছে না? সরকার হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যতের জন্য হুমকি ডেকে আনছে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, OHCHR কোনদিনই নিরপেক্ষ নয়। এর অর্থায়ন আসে মূলত পশ্চিমা দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে। এদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় থাকে স্পষ্ট – “কোন দেশ আমাদের কথা না শুনলে, তাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দুনিয়ার সামনে ছোট করো, নিষেধাজ্ঞা দাও”।

বাংলাদেশকে এখন দরকার নৈতিকভাবে শক্তিশালী হওয়া, আন্তর্জাতিক সম্মান বজায় রাখা, আর সবচেয়ে বড় কথা – স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা রক্ষা করা। কোনোভাবেই এমন একটি বিদেশি অফিস স্থাপনের অনুমতি দেওয়া উচিত নয়, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে।

এই ‘মানবাধিকার’ কথাটা এখন অনেকটা রাজনৈতিক অস্ত্রের মতো ব্যবহার করা হয়। একেক সময় একেক দেশে গিয়ে ‘মানবাধিকারের নামে নজরদারি’, অথচ ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, ইয়েমেন, রোহিঙ্গা, বা সুদানে যখন সত্যিকারের গণহত্যা চলে, তখন এরা চুপ!

তাই আমাদের সবার চোখ খোলা রাখা জরুরি। ‘মানবাধিকার’ এর নামে জাতীয় সার্বভৌমত্বের ভিত না কেঁপে ওঠে, সে দিকে নজর দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
-রাশিদুল হাসান সুজন

  • Related Posts

    ধিক্কার!

    বিষাদ বিবরণ; ধিক্কার! ওসমান হাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে অগ্নিসংযোগ, এটি একটি জঘন্য ও ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। কিছু দুষ্কৃতিকারী গোষ্ঠীর অযৌক্তিক দাবি আদায়ের নামে এ ধরনের উন্মত্ত…

    “বাংলার বিষাদ: ক্ষমতা ও মানবতার মাঝে এক জাতির যন্ত্রণাগাথা”

    “Story In Sadness of Bangla A Nation Between Power & Humanity” 👉 এইসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা কখনোই জনমনে সত্যিকারের আতঙ্ক সৃষ্টি করে না; বরং প্রমাণ করে দেয় আমরা কতটা অভ্যস্ত হয়ে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *